গহের আলীর তাল সাম্রাজ্য – হাসান মীর

0
919
গহের আলীর তাল সাম্রাজ্য
গহের আলী

সাম্প্রতিককালে দেশের বিভিন্নস্থানে বজ্রপাতের ফলে প্রাণহানির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ অধিদপ্তর দেশজুড়ে কয়েক লাখ তালগাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উঁচু গাছের উপর বজ্রপাতের সম্ভাবনা বেশি থাকে বলে এই সিদ্ধান্ত। বেশি সংখ্যায় তালগাছ যেমন বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা হ্রাসে সহায়ক হবে তেমনি প্রতিবেশ উন্নয়ন, গ্রামের মানুষের জন্যে তালশাঁস, পাকা তাল ও তালের রস সংগ্রহ সহজলভ্য হবে, পাখ- পাখালি আশ্রয় পাবে ( বাবুইয়ের বাসা তো এক বিস্ময়কর শিল্পকর্ম ) , তালপাতার পাখা নির্মাণেরও প্রধান অবলম্বন এই তালগাছ ।

নওগাঁর মহাদেবপুর উপজেলার শিকারপুর গ্রামের ভিক্ষুক প্রায় শতবর্ষী গহের আলী এত তথ্য- উপাত্ত জানা ছিল না। তিনি অতশত না ভেবেই রাজশাহী — নওগাঁ মহাসড়কের দুই কিলোমিটার অংশে কয়েক বছরের ব্যবধানে ১২ হাজারের মতো তালের আঁটি পুঁতেছিলেন। ভিক্ষার জন্যে তিনি গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন, কোথাও তালের আঁটি চোখে পড়লে সেটি তুলে এনে রাস্তার পাশে একজায়গায় পুঁতে দিতেন । সেই গাছগুলি বড় হয়েছিল , অনেক গাছে তালও ধরেছিল। গহের আলীর তালগাছ লাগানোর এই খবর ” গহের আলীর তাল সাম্রাজ্য ” নামে একটি ফিচার হয়ে দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ই নভেম্বর। অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমেও খবরটি গুরুত্ব পায়। পরের বছর ( ২০০৯) বৃক্ষরোপনে বিশেষ অবদানের জন্য গহের আলী প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে জাতীয় পরিবেশ পদক গ্রহণ করেন। এর পরের বছর শতবর্ষের বৃদ্ধ গহের আলী পরপারের যাত্রী হন। তার হাতে রোপন করা তালগাছগুলির এরপরও অনেক বেশিদিন বেঁচে থাকার কথা ছিল, কিন্তু এই গাছগুলি সেখানে ‘ উন্নয়নের জোয়ারে ‘ বাধা হয়ে দেখা দেয়। কর্তৃপক্ষ সড়ক প্রশস্ত করতে গিয়ে বছরখানেক আগে গহের আলীর ১২ হাজারসহ দীর্ঘ সড়কের দুই পাশের প্রায় ৩০ হাজার তাল ও অন্যান্য গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। । তারা অবশ্য তখন এই বলে আশ্বাসবাণী শুনিয়েছিলেন যে , ভবিষ্যতে প্রশস্ত সড়কের দুই পাশে আরও অনেক বেশি সংখ্যায় এবং ‘ উন্নত জাতের তালগাছ ‘ লাগানো হবে। এসবই এক বছর আগের ঘটনা। ইতোমধ্যে আর নতুন করে জানা যায়নি যে রাস্তা প্রশস্ত করার নামে তালগাছগুলি সাবাড় করে নগণ্য গহের আলীর বিশাল স্মৃতিকেও মুছে ফেলা হয়েছে কিনা । পত্র-পত্রিকায় এ নিয়ে আর কিছু লেখা হয়েছে কি-না তাও চোখে পড়েনি ।

গহের আলী ছিলেন সামান্য একজন ভিক্ষুক, তারপরেও সেই ভিক্ষুক জীবনের সামান্য সামর্থের মধ্যে তিনি ১২ হাজার তালগাছ রোপন করে খ্যাত হয়েছিলেন, পত্রিকায় ছবি ছাপা হয়েছিল, এমনকি সরকার প্রধানের হাত থেকে পদক গ্রহণের বিরল সৌভাগ্যও তার হয়েছিল – এই কি অনেক নয় ? সময়ের আবর্তে কত রাজা- মহারাজার স্মৃতিই যেখানে হারিয়ে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত একজনের নামফলক সরিয়ে আরেকজনের নামফলক লাগানো হচ্ছে, সেখানে একজন সামান্য ভিক্ষুকের ভাগ্যে বেশি কী আর জুটতে পারে !

Facebook Comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here